একটা ছবি বড়জোর কিই-বা করতে পারে? একটা ছবি হয়তো অনেক কিছুই করতে পারে। কিন্তু কেউই হয়তো বলবেন না, একটি ছবি পুঁজিবাদ বিরোধী শহীদকে বানিয়ে দিতে পারে পুঁজি বাজারের ফ্যাশন আইকন।
ট্রাজেডি হলেও সত্য যে আর্নেস্তো চে গুয়েভারার কপালে জুটেছে এমন দুর্ভাগ্য। চে’র একটি ছবিই যথেষ্ট ছিল একজন পুঁজিবাদবিরোধী শহীদকে বাজারের লাভজনক প্রতীকে পরিণত করতে।
আর্নেস্তো চে গুয়েভারা! সাহস, বিদ্রোহ, প্রতিবাদ ও স্বাধীনচেতা ভাবনার প্রতীক হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিত। চে’র ছবি এখন টি-শার্ট, মগ, লাইটার, তোয়ালে, এমনকি মানিব্যাগেও ছাপা হয়। রেস্তোরাঁ, দোকান, মদ আর সিগারের নামও রাখা হয় চে’র নামে। এইসব কিছুর আড়ালে প্রায়ই হারিয়ে যায় আর্জেন্টিনার সেই বিপ্লবীর আসল ব্যক্তিত্ব। চে গুয়েভারা আমৃত্যু লড়াই করেছেন। কখনোই এমন জনপ্রিয়তা চাননি।
যেভাবে একটি ছবি সবকিছু বদলে দিল
১৯৬০ সালের ৫ মার্চ, কিউবান বিপ্লবের পর চে অংশ নিয়েছিলেন হাভানা বন্দরে বিস্ফোরণে নিহতদের স্মরণে আয়োজিত এক সমাবেশে।
সেখানেই কিউবান সাংবাদিক আলবের্তো কোর্দা তাঁর একটি ছবি তোলেন। কোন এক দূর ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে দৃঢ়চিত্তে দাঁড়িয়ে থাকা চে’র সেই ছবিটিই বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠে। ছবিটিতে চে ছাড়াও ছিল আরও কিছু মানুষ, ছিল একটা পাম গাছ।
এই ছবির ভিত্তিতে আইরিশ শিল্পী জিম ফিটজপ্যাট্রিক তৈরি করেন বিখ্যাত লাল-কালো প্রতিকৃতি। ছবিটি দীর্ঘদিন সাধারণ মানুষের অজানাই থেকে যায়। সাত বছর পর ছবিটি ইতালির বামপন্থী কর্মী জিয়ানজিয়াকোমো ফেলত্রিনেল্লির নজরে এলে তা নতুন করে আলোচনায় আসে। তিনি কোর্দার কাছ থেকে ছবিটির কপি চান। কোর্দা বিনা পয়সায় তাঁকে কয়েকটি কপি দেন।
আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে গ্লোবাল ব্র্যান্ডে
ছবিটির স্বত্বাধিকার নিয়ে কখনো লড়েননি আলবের্তো কোর্দা। তিনি বরং সবাইকে ছবিটি বিনামূল্যে ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। সেই সময়েই ৩৯ বছর বয়সী চে গুয়েভারা বলিভিয়ার যুদ্ধে মার্কিন গোয়েন্দাদের হাতে আহত হয়ে বন্দি হন। গোপনে তাকে হত্যা করে কবর দেওয়া হয় অজানা স্থানে।
এরপর ফেলত্রিনেল্লি কোর্দার তোলা সেই ছবির পোস্টার বানিয়ে বিক্রি শুরু করেন। মাত্র ছয় মাসে তিনি বিক্রি করেন দুই মিলিয়নেরও বেশি পোস্টার। অল্প সময়েই চের সেই প্রতিকৃতি নাইকির লোগো আর ম্যাকডোনাল্ডসের সোনালি খিলানের মতোই বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে পরিচিত প্রতীকের একটিতে পরিণত হয়।
পুঁজিবাদবিরোধীর প্রতিকৃতি থেকেই বড় হচ্ছে পুঁজিবাজার
চে গুয়েভারা ছিলেন ভোগবাদী সমাজের কঠোর সমালোচক। এমন সমাজ তিনি চাননি, যেখানে মানুষ কেবল কিছু কিনেই নিজেকে অন্যদের চেয়ে বেশি মর্যাদাবান হিসেবে প্রদর্শন করতে পারে। চে’র কাছে মুক্তবাজার ব্যবস্থা ছিল অন্যায্য ও বৈষম্যমূলক। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধনী দেশগুলোর দরিদ্র দেশগুলোকে বিনা স্বার্থে সাহায্য করা উচিত। মন্ত্রী হয়েও তিনি নিজ হাতে শ্রমিক আর কৃষকদের সঙ্গে কাজে অংশ নিতেন।
আজ মানুষ বিপ্লব না বুঝে বা চে’কে না জেনেই তাঁর প্রতিকৃতি বিক্রি করে অর্থ কামাচ্ছে, তা জেনে বিপ্লবী এই নেতা নিশ্চয়ই খুশি হতেন না।
কোর্দার ১৯৬০ সালের ছবিটি থেকে যখন পামগাছ ও পাশের মানুষটি বাদ দেওয়া হলো, তখন সেটি আর রাজনৈতিক প্রতীক থাকল না। বরং হয়ে উঠলো ফ্যাশনের এক প্রতীক। এমনকি সমাজতান্ত্রিক কিউবাতেও চে গুয়েভারার প্রতিকৃতি পোস্টকার্ড ও উপহার সামগ্রী হিসেবে বিক্রি হয়।
