আবুধাবির প্রকৃতিতে আলো-ছায়ার খেলা যখন সন্ধ্যার আবরণে ঢেকে যাচ্ছিল, বাংলাদেশের ইনিংসের আলো নিভে গেছে তার অনেক আগেই। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে যা ঘটল, তা নতুন কিছু নয়, বরং পুরনো এক হতাশার প্রতিধ্বনি। একের পর এক দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যাটিং, অস্থির সিদ্ধান্ত, আর আত্মবিশ্বাসহীন উপস্থিতি, সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট আজ যেন এক ক্লান্ত সত্ত্বা, যে জানে নিজের ব্যর্থতার পরিণতি, তবুও কিছুই বদলাতে পারছে না।
প্রথম ওয়ানডেতে যেমন হয়েছিল, দ্বিতীয় ম্যাচেও তারই ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের ব্যাটিং ধসে পড়ল কাগজের প্রাসাদের মতো। তানজিদ তামিম, হৃদয়, শান্ত, জাকের, সোহান সবার মধ্যে যেন এক অজানা আতঙ্ক। কেউ নিজের জায়গা নিয়ে নিশ্চিত নয়, কেউ হয়তো নিজের খেলার আনন্দই হারিয়ে ফেলেছে। যেখানে তার কাজ ছিলো মাঠে আগুন ঝরানো, সেখানে আজ তাদের চোখে কেবল এক ধরনের নিস্তব্ধতা। আর এখানেই বোঝা যাচ্ছে সবচেয়ে গভীর বাস্তবতা আপনি যে কাজটি করবেন, তা যদি আনন্দের সঙ্গে না করেন, সেই কাজের ফলাফলেও তা ফুটে উঠবে। ক্রিকেট তার ব্যতিক্রম নয়। পারফরম্যান্স-ভিত্তিক এই খেলায় মানসিক প্রশান্তি যতটা প্রয়োজন, শারীরিক দক্ষতাও ততটাই। কিন্তু হলফ করে বলা যায়, এই দলটির ড্রেসিং রুমের ভেতরে সেই প্রশান্তির কোনো অস্তিত্ব নেই। গুমোট এক আবহ, অদৃশ্য এক অস্বস্তি যেন ঢেকে রেখেছে গোটা পরিবেশ।
তাদের মেধা ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস কারও নেই। কারণ, তারা প্রতিভাবান। কিন্তু সেই প্রতিভা কেবল তখনই আলো ছড়ায়, যখন মন মুক্ত থাকে, যখন খেলা হয়ে ওঠে আনন্দের। আজকের বাংলাদেশ দলে সেই আনন্দের ছোঁয়া নেই। কেউ খেলছে বাধ্যতামূলক দায়িত্বে, কেউ খেলছে আত্মপ্রমাণের চাপে। দল হয়ে তারা যেন দলই নয়, একটা অসুখী পরিবারের মতো, যেখানে সবাই নিজের ঘরে আটকে আছে, কিন্তু কারও সঙ্গে কারও সম্পর্ক নেই।
দীর্ঘদিন ধরেই এই দলের বডি ল্যাংগুয়েজ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। মাঠে তাদের হাঁটা, ক্যাচ নেওয়ার পরের প্রতিক্রিয়া, উইকেট পতনে সাড়া, সবকিছুই যেন নিঃশব্দ, উদাসীন। সেখানে দলীয় উৎসাহ, পারস্পরিক উচ্ছ্বাস, সেই পুরোনো। একসাথে লড়বো, মনোভাবটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। স্পষ্ট বোঝা যায়, দলটা এখনো দল হয়ে উঠতে পারেনি।
এই মানসিক অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিক ব্যর্থতা। পরিসংখ্যান বলছে, গত এক বছরে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত ওয়ানডে ব্যাটিং গড় নেমে এসেছে ২৪ এর নিচে। টপ অর্ডার থেকে মিডল অর্ডার পর্যন্ত কারও ইনিংসই আর আত্মবিশ্বাসের প্রতীক নয়। তানজিদ তামিমের ব্যাটে দেখা যায় অস্থিরতা, হৃদয়ের ইনিংস থেমে যায় অর্ধেক পথে, শান্তর ব্যাট থেকে আসে বিচ্ছিন্ন ঝলকানি। কারও মধ্যে নেই স্থিতি বা অভ্যন্তরীণ দৃঢ়তা।
